ই-সেবা

জমির খতিয়ান সংশোধন: একটি বিস্তারিত গাইড

জমির খতিয়ান হলো দখলের প্রামাণ্য দলিল, মালিকানার দলিল নয়। তাই খতিয়ানে কোনো ভুল থাকলে তা সংশোধন করা অত্যন্ত জরুরি। এই লেখায় আমরা খতিয়ান সংশোধনের বিভিন্ন ধাপ এবং পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

১. খতিয়ান ভুল কেন হয়?

  • করণিক ভুল: নাম, ঠিকানা, দাগ নম্বর, অংশের হিসাবে ভুল।
  • প্রিন্টিং ভুল: ছাপার কারণে তথ্য বিকৃতি।
  • জরিপকালীন ভুল: জরিপকারীদের অসাবধানতা বা অজ্ঞাতসারে সৃষ্ট ভুল।
  • প্রতারণামূলক লিখন: উদ্দেশ্যমূলকভাবে ভুল তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা।

২. খতিয়ান সংশোধনের প্রাথমিক ধাপ (জরিপের খসড়া প্রকাশের পর):

জরিপের খসড়া প্রকাশিত হওয়ার পর যদি কোনো ভুল ধরা পড়ে, তবে নিম্নলিখিত উপায়ে তা সংশোধন করা যায়:

  • ৩০ ধারায় আবেদন: রেভিনিউ অফিসারের নিকট ৩০ ধারায় আবেদন করে ভুল সংশোধনের জন্য আবেদন করা যায়।
  • ৩১ ধারায় আপিল: উক্ত রায়ের বিরুদ্ধে সেটেলমেন্ট অফিসারের নিকট ৩১ ধারায় আপিল করে ভুলগুলো সংশোধন করা যায়।

৩. চূড়ান্ত খতিয়ান প্রকাশের পর সংশোধন প্রক্রিয়া:

যদি উল্লিখিত সময়ের মধ্যে ভুল সংশোধন করা না হয় এবং চূড়ান্ত খতিয়ান প্রকাশিত হয়ে যায়, তাহলেও কিছু ক্ষেত্রে ভুল সংশোধন সম্ভব।

  • করণিক ভুল ও প্রিন্টিং ভুল: চূড়ান্ত রেকর্ড প্রকাশিত হওয়ার পরও করণিক ভুল বা প্রিন্টিং ভুল সেটেলমেন্ট অফিসার সংশোধন করতে পারেন। সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাজস্ব কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন এবং তিনি এই ধরনের ভুল সংশোধনের নির্দেশ দিতে পারেন।
    • প্রক্রিয়া: সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবেদন প্রাপ্তির পর অথবা প্রতিবেদন পাওয়ার পর পূর্ববর্তী জরিপের কাগজপত্র, প্রাথমিক খাজনা বিবরণী, কালেক্টরের দপ্তরে সংরক্ষিত খতিয়ানের কপি এবং ২ নং রেজিস্টার পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান শেষে সংশোধন করার নির্দেশ দেবেন।
    • উদাহরণ: নামের ভুল, অংশ বসানোর হিসাবে ভুল, দাগসূচিতে ভুল, ম্যাপের সঙ্গে রেকর্ডের ভুল, জরিপকালে পিতার মৃত্যুর কারণে সন্তানদের নামে সম্পত্তি রেকর্ড হওয়ার কথা থাকলেও তা মূল প্রজা বা পিতার নামে রেকর্ড হওয়া ইত্যাদি।
  • প্রতারণামূলক লিখন: প্রতারণামূলক লিখনের মাধ্যমে সৃষ্ট চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত রেকর্ড সংশোধনের জন্য রাজস্ব কর্মকর্তা প্রজাস্বত্ত্ব বিধিমালা, ১৯৫৫ এর বিধি ২৩ এর উপবিধি (৪) অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
  • যথাযথ ভুল (Bonafide Mistake): The State Acquisition and Tenancy Act, 1950 এর ১৪৯ ধারার (৪) উপধারা মতে, ভূমি আপিল বোর্ড যে কোনো সময় যে কোনো খতিয়ানে বা চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত সেটেলমেন্ট রেন্ট-রোলে অন্তর্ভুক্ত যথার্থ ভুল সংশোধনের আদেশ দিতে পারে।

৪. আদালতের মাধ্যমে খতিয়ান সংশোধন:

যদি করণিক বা প্রিন্টিং ভুলের বাইরে অন্য কোনো বড় ধরনের ভুল থাকে, তবে সেগুলোর সংশোধনের ক্ষমতা একমাত্র আদালতের।

  • ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনাল: চূড়ান্ত খতিয়ান প্রকাশের ১ বছরের মধ্যে ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনালে/ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে সংশোধনীর মামলা করতে হবে। এই সময়সীমা আরও ১ বছর বর্ধিত হতে পারে।
    • প্রয়োজনীয় কাগজপত্র:
      • উক্ত জমিতে মালিকানার সকল দলিলপত্র (যেমন মূল দলিলের সার্টিফাইড কপি, বায়া দলিল, পূর্বের খতিয়ানের কপি)
      • চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত ভুল রেকর্ডের কপি
      • আইডি কার্ডের ফটোকপি
    • পরবর্তী ধাপ: রায়ের বিরুদ্ধে ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনাল এবং মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচার্য।
  • দেওয়ানি আদালত: উল্লিখিত সময়ের মধ্যে মামলা করতে না পারলে, ভুল সম্পর্কে জানার ৬ বছরের মধ্যে দেওয়ানি আদালতে রেকর্ড ভুল ও অশুদ্ধ মর্মে ঘোষণামূলক মোকদ্দমা করতে হবে।
    • ডিক্রি/রায়: আদালত ডিক্রি/রায় দিলে সেই ডিক্রির সার্টিফাইড কপি নিয়ে খতিয়ান সংশোধনের জন্য সেটেলমেন্ট অফিসারের কাছে আবেদন করতে হবে। সেটেলমেন্ট অফিসার সবকিছু দেখে সন্তুষ্ট হলে পূর্বের ভুল রেকর্ডটি সংশোধন করে নতুন করে একটি রেকর্ড প্রকাশ করবেন।

৫. খাস খতিয়ানভুক্ত জমি সংশোধন:

ভুলক্রমে কোনো ব্যক্তির জমি ১নং খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলে একই পদ্ধতিতে তা সংশোধন করতে হবে।

৬. ভূমি মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র:

ভূমি মন্ত্রণালয়ের ‘আইন শাখা-০১’ এর, গত ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৫ তারিখের নং- ৩১.০০.০০০০.০৪২.৬৭.০৩১.১১.৮৪১ স্মারকে প্রচারিত ‘পরিপত্রে’ চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত রেকর্ড বা খতিয়ানের ভুল সংশোধনের জন্য ৩ ধরনের কর্তৃপক্ষের কথা বলা হয়েছে:

  • রাজস্ব কর্মকর্তা (Revenue Officer) / সহকারী কমিশনার (ভূমি): করণিক ভুল এবং প্রতারণামূলক লিখন সংশোধন করতে পারেন।
  • ভূমি আপিল বোর্ড: যেকোনো ধরনের যথার্থ ভুল সংশোধন করতে পারেন।

উপসংহার:

জমির খতিয়ানে যেকোনো ধরনের ভুল দেখা গেলে দ্রুততার সঙ্গে তা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। ভুলের ধরন অনুসারে সঠিক কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন বা মামলা দায়ের করে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। প্রয়োজনে একজন অভিজ্ঞ সিভিল ল’ইয়ারের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button