ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা | মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আশঙ্কা ও বৈশ্বিক প্রভাব
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা চলমান। এই দ্বন্দ্ব কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্য এবং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কূটনৈতিক টানাপোড়েন, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং সামরিক সংঘর্ষের ভয়ের কারণে পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল ও আশঙ্কাজনক রূপ ধারণ করেছে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার পেছনের গভীর ইতিহাস
- ১৯৭৯ সালের ইরান বিপ্লব: যখন শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভীকে ক্ষমতাচ্যুত করে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন মার্কিন দূতাবাস দখল হয় এবং ৫২ মার্কিন কূটনীতিককে দীর্ঘ ৪৪৪ দিন ধরা হয়। এটি দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় ধাক্কা ছিল।
- পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিতর্ক: ইরানের পারমাণবিক উন্নয়নকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে আসছে। ইরান বলছে এটি শুধুমাত্র শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে। এই বিভেদের কারণে দীর্ঘ সময় ধরে সেভাবেই উত্তেজনা বেড়েছে।
- ২০১৫ সালের JCPOA (Joint Comprehensive Plan of Action): ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমাবদ্ধ করার জন্য স্বাক্ষরিত এই ঐতিহাসিক চুক্তি। তবে ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন চুক্তি থেকে একতরফাভাবে সরে এসে কড়া অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
- ২০২০ সালে জেনারেল কাসেম সোলাইমানির হত্যা: ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক নেতা সোলাইমানিকে ইরাকের বাগদাদে মার্কিন ড্রোন হামলায় হত্যা করা হয়, যা উত্তেজনাকে আরও তীব্র করে।
বর্তমান উত্তেজনার মাত্রা ও সামরিক অবস্থান
যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করে এবং ইরানের ওপর রাজনৈতিক ও সামরিক চাপ বাড়িয়েছে। ইরানও পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে পারমাণবিক কর্মসূচি দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, এবং হরমুজ প্রণালীতে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করেছে। এই প্রণালী হলো বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ যেখানে প্রতিদিন তেলের বিশাল পরিমাণ বহন হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান ও তার মিত্ররা সেখানে কয়েকটি ট্যাংকার আটক করেছে, যা আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও জ্বালানির বাজারে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে।
মধ্যপ্রাচ্য ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব
- তেলের মূল্যবৃদ্ধি: হরমুজ প্রণালী বন্ধ বা ঝুঁকিপূর্ণ হলে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হয়, যার ফলে তেলের দাম লাফিয়ে বাড়ে। এতে করে উন্নয়নশীল দেশগুলোসহ পুরো বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
- সামরিক সংঘর্ষের ঝুঁকি: মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো ও ইরানের মিত্রদের মধ্যে যেকোনো মুহূর্তে সংঘর্ষ শুরু হওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করে তোলে।
- আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা: তেলের দামসহ অন্যান্য পণ্যের বাজার অস্থির হয়, শেয়ার বাজারে পতন ঘটে এবং বিনিয়োগকারীরা সতর্ক হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য প্রভাব ও চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রা অনেকাংশে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি ও পণ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনার কারণে তেলের দাম বেড়ে গেলে বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট গাঢ় হতে পারে। এতে সরাসরি জীবিকা, পরিবহন খরচ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। এছাড়া এই অঞ্চলের অস্থিরতা থেকে কর্মসংস্থানও প্রভাবিত হতে পারে, কারণ অনেক বাংলাদেশি প্রবাসী মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করেন।
আন্তর্জাতিক পরিসরে সম্ভাব্য সমাধান ও ভবিষ্যৎ পথ
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক সংলাপ, মধ্যস্থতাকারী দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সক্রিয় ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি। দুই পক্ষকেই পারমাণবিক চুক্তি ও শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে দ্বন্দ্ব নিরসনে আগ্রহী হতে হবে। এ ছাড়া, সামরিক উত্তেজনা কমিয়ে আনার জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের চাপও দরকার। শান্তি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তা সুসংহত করা সম্ভব হবে।
উপসংহার
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা একটি জটিল ও বহুমাত্রিক সমস্যা যা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নয়, সমগ্র বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এর প্রভাব অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে পড়ছে। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব এই উত্তেজনা প্রশমনে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া এবং শান্তি স্থাপনে সহায়তা করা। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে অবশ্যই বিষয়টিকে গভীরভাবে মনোযোগ দিয়ে তাদের নিরাপত্তা ও অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখতে কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।